এই সময়ে উর্মিলা

চলমান সময়ের ব্যস্ত অভিনেত্রী উর্মিলা শ্রাবন্তী কর। প্রায় এক দশক ধরে তিনি শোবিজ অঙ্গনে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। ২০০৯ সালে লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার রিয়েলিটি শো দিয়ে আলোচনায় আসনে তিনি। এক দশকের পথচলায় উর্মিলা অর্জন করেছেন দর্শকের ভালোবাসা, অভিজ্ঞতা। সম্প্রতি এক আন্তরিক আলাপে উর্মিলা তুলে ধরেছেন সমসাময়িক বিষয়বস্তু নিয়ে তার ভাবনা। পাঠকের জন্য সেই আলাপের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।

ঈদের জন্য একটি বাদে বেশকিছু খন্ড নাটকের কাজে ব্যস্ত আছেন উর্মিলা। তিনি জানালেন চলতি সময়ের কয়েকজন ব্যস্ত নির্মাতার সাথে ঈদের কাজ করছেন তিনি। কিছু নাটকের শুটিং চলছে, কিছুর শেষ, কিছুর শুরু হবে। ঈদের জন্য একটিমাত্র ধারাবাহিকে কাজ করছেন তিনি, বাকিগুলো খন্ড নাটক। উর্মিলা ধারাবাহিকের চেয়ে খন্ড নাটকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তার মতে খন্ড নাটকে কাজের মান ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়। ঈদের কাজের পাশাপাশি চলতি কাজগুলোও এগিয়ে নিচ্ছেন উর্মিলা।

প্রয়াত কথাসাহিত্য়িক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের সাথে কাজ করেছেন উর্মিলা

ইদানিং নাটকের সংলাপ, গল্প নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। এ বিষয়ে উর্মিলার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার নিজের কাছেই অনেক সময় বিরক্ত লাগে কিছু কিছু জিনিস। এগুলো হলো তুই-তোকারি, অহেতুক গালিগালাজ, অনেক লাউড একটিং, চিৎকার – চেঁচামেচি, দুই – তিনটা চরিত্র ভিত্তিক গল্প এবং খুবই মনোটোনাস একটি ব্যাপার থাকে। সব জায়গায় যেন একই জিনিস দেখছি।

উর্মিলা আরো বলেন, আমি খুব ছোটবেলা থেকেই, যখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি তখন থেকেই কাজ করি। মাঝখানে কিছু বছর কাজ করিনি পড়াশোনার প্রেশারের জন্য, এরপর আবার কাজ করা শুরু করেছি। এরপর গ্যাপ দিয়ে আবার কাজ শুরু করেছি। আমি বলতে পারবো যে আমি অনেক অনেক ভালো গল্পে কাজ করেছি। ছোট বয়সেই ভালো ডিরেক্টরদের সাথে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের মতো অনেক সিনিয়র ডিরেক্টরের সাথে কাজ করেছি। দুই বছর আগেও আমি যেরকম গল্প পেয়েছি বা কাজ করেছি এখন সেরকম গল্প একেবারেই পাই না। কাজ করতে গেলে নিজের কাছেই অনেক সময় বিরক্ত লাগে। আশেপাশের অডিয়েন্সের কাছ থেকেও নেতিবাচক কথাবার্তা শুনতে হয়। এত খারাপ অবস্থা কেন গল্পের, এত বাজে অবস্থা কেন স্ক্রিপ্টের; এটা আসলে কোনক্রমেই কাম্য না।

উর্মিলার কাছে টেলিভিশন একটি ইমোশনাল ব্যাপার

এমন অবস্থার সমাধান কি হতে পারে সে বিষয়েও অভিমত দিলেন উর্মিলা। তার মতে শিল্পীকে সোচ্চার হতে হবে প্রথমেই। তিনি বলেন, অন্যদের দায়িত্ব তারা যার যার জায়গা থেকে বলবে, কিন্তু একজন শিল্পী হিসাবে আমি বলতে পারি একজন শিল্পী স্ক্রিপ্ট দেখে সবার আগে অবজেকশান দেয়া উচিৎ। তারা বলা উচিৎ আমি এ ডায়লগ অন-স্ক্রিণ দেব না। সাধারণ মানুষের উপর কিন্তু আর্টিস্টদের প্রভাব অনেক পড়ে। আমার ফ্যান ফলোয়ার কিংবা দর্শক যাদের পছন্দ করে তাদের কাজ কিন্তু দেখে এবং ইনস্ট্যান্ট একটা বাজে রিএকশান হয়। আমাদেরই আসলে প্রটেস্ট করা উচিৎ অহেতুক কেন আমি বয়ফ্রেন্ডকে তুই – তোকারি, তোকে মেরে ফেলবো এসব কথা বলবো? যে মেয়েটা এই নাটকটা দেখছে সে তো রিয়েল লাইফে এটা এপ্লাই করবে।

টেলিভিশনের দর্শক কমে যাচ্ছে, ইউটিউবে নাটক দেখার হার বাড়ছে। উর্মিলার কাছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি ব্যাপারটিকে ইতিবাচকভাবে দেখেন বলে জানালেন। তিনি বলেন, টিভি আমার কাছে ইমোশনাল একটা ব্যাপার। ছোটবেলা থেকেই আমরা টিভি দেখতাম, একটা ড্রইংরুমে ফ্যামিলি মেম্বাররা মিলে টিভি দেখতো – ঐ জিনিসটা এখন আসলে নাই। আমি অবশ্যই চাই টিভি নাটক মানুষ দেখুক, কারণ দর্শক টিভিতে নাটক না দেখলে আমরা আর্টিস্টরা সার্ভাইভ করবো না। কিন্তু নাটক আবার মোবাইলে দেখছে, ল্যাপটপে দেখছে এটাও আমার কাছে পজিটিভ মনে হয়। মানুষ নাটক দেখছে তো! টিভির সাথে তো টাইম মেলানো সবসময় সম্ভব হয় না। আমি নিজের নাটকও অনেক সময় দেখতে পারিনা, দেখা যায় সে সময়ে আমার শুটিং আছে বা অন্য কোন কমিটমেন্ট আছে কিংবা ঘুমাচ্ছি। পরে যখন কেউ আলাদাভাবে অন্য কোথাও নাটকটা দেখে এটা আমার কাছে নেতিবাচক মনে হয় না। কিন্তু এটাও মনে হয় যদি টিভি নাটকে বিজ্ঞাপন কম দিত, তাহলে সবাই একসাথে বসে নাটক দেখা যেত। এই ব্যাপারটা খুব মিস করি।

অভিজ্ঞ শিল্পীদের অভিনয়ে দেখতে চান উর্মিলা

কথার ছলে জানতে চাওয়া হয় একজন শিল্পী যখন অনেকগুলো কাজ একইসঙ্গে করেন তখন তার লুকের কোন পার্থক্য থাকেনা, দর্শকও বিরক্ত হয় একই লুকে শিল্পীকে একাধিক নাটকে দেখে। উর্মিলার মতে এজন্য এমন মেকআপ আর্টিস্ট প্রয়োজন যিনি অভিজ্ঞ, কোন স্ক্রিপ্টে কোন লুক মানানসই তা বুঝতে হবে তাকে। পাশাপাশি নির্মাণ সংশ্লিষ্টদেরও জানা থাকতে মেকআপের গুরুত্ব কতখানি। তাহলেই বিভিন্ন লুকে শিল্পী দর্শকের সামনে উপস্থিত হতে পারবেন।

নাটকে বা সিনেমায় জুটি নিয়েও কথা বললেন উর্মিলা। তার মতে জুটি হতে পারে, তবে সে জুটিকে বিরক্তির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাবেনা। উর্মিলা বলেন, আমরা যখন ছোটবেলায় নাটক দেখেছি তখন জুটি কিন্তু ছিল। এর মানে এই নয় যে অন্য কারো সাথে কাজ করবো না। হয়তো মাসে পাঁচটি বা দুটি নাটক করে মানুষের পছন্দের জুটি, সবাই অপেক্ষা করতো তাদের নাটকের জন্য। এটা মনোটোনাস পর্যায়ে নেয়া আসলে উচিৎ না। যদি অডিয়েন্স এপ্রিশিয়েট করতো তাহলে ঠিক ছিল, কিন্তু অডিয়েন্সই তো এটা ঠিকভাবে গ্রহণ করছেনা। তারাই বিরক্ত। সে জায়গা থেকে তো চ্যানেলেরও দায়িত্ব আছে, আমরা না চাইলেও অনেককাজ করে ফেলি। হয়তো ভালো কাজের সংখ্যা কম হয় কিন্তু কাজ তো হয়। কিন্তু অনেক আর্টিস্ট আছেন ঘরে বসা, তারা কাজ পাচ্ছেন না। এটা খুবই আনফরচুনেট। ডিরেক্টরদেরও খেয়াল করা উচিৎ, প্রডিউসারদেরও কেয়ারফুল হওয়া উচিৎ। কারণ চারজন মানুষই কাজ করবে, বাকি সবাই বসে থাকবে? তাহলে তারা কি করবে?

উর্মিলা এ বছরের শেষদিকে সিনেমায় আসতে পারেন

নাটকের চরিত্র কমে যাওয়া বিষয়ে উর্মিলা বলেন, এটা আসলে ব্যালেন্সের ব্যাপার। একদিক থেকে কথা বললে ভুল হবে। দেখা যায় কিছু আর্টিস্ট এতো বেশি সম্মানি নেয়, হয়তো তারা ডিজার্ভও করে যে ডিরেক্টর বেচারা কি করবে; চাইলেও সে ফ্যামিলি ড্রামা করতে পারেনা। কারণ এত টাকা দিয়ে নায়ক নায়িকাকে নেয়ার পরে অন্যদের জন্য তো বাজেটই থাকেনা। সেক্ষেত্রে একটা নীতিমালা করে দেয়া উচিৎ যে এর উপরে সম্মানি নেয়া যাবেনা। চ্যানেল থেকেও যদি রিকোয়ারমেন্ট দেয়া থাকে যে এতজন ফ্যামিলি মেম্বার যেন থাকে কিংবা নায়ক – নায়িকা থেকে বেরিয়ে এসে নাটক করতে হবে; তাহলে হয়তো কিছু একটা হবে।

কথায় কথায় উর্মিলার কাছে জানতে চাওয়া হয় সিনেমা নিয়ে তার পরিকল্পনা সম্বন্ধে। তিনি হতাশ করলেন না। সিনেমার একটা সুখবর এ বছরের শেষের দিকে দিতে পারেন বলে আভাস দিলেন উর্মিলা। এখনই এ বিষয়ে কিছু জানাতে চাচ্ছেন না তিনি। আরেকটি প্ল্যাটফর্ম ওয়েব সিরিজের প্যাটার্ণ তার খুব একটা পছন্দ নয়। তবুও যদি ভালো গল্প ও ভালো ব্যানারের হয় তাহলে তিনি ওয়েব সিরিজে কাজ করতেও পারেন। একটি ওয়েব সিরিজের কথা চলছে, খুব শীঘ্রই সেটিতে কাজ করার সম্ভাবনার কথা জানালেন তিনি।

নিজের ক্যারিয়ার ও নাটক নিয়ে ইতিবাচক প্রত্যাশা রয়েছে উর্মিলার। তিনি বলেন, ভালো গল্পে কাজ করতে চাই, সুন্দর সুন্দর স্ক্রীপ্টে কাজ করতে চাই। সবাই যেন ডেডিকেশান নিয়ে কাজ করেন এটাই চাই যাতে অডিয়েন্স পছন্দ করে। কাজ করে শান্তি লাগবে, ভালো লাগবে এগুলোই চাওয়া।