পুরনো নির্মাতাদের ফেরাতে হবে : মৌটুসী বিশ্বাস

ছোটপর্দার নন্দিত অভিনেত্রী মৌটুসী বিশ্বাস সম্প্রতি পান্থ শাহরিয়ারের রচনায় নিয়াজ মাহবুবের পরিচালনায় ‘জলকুমারী’ নাটকে ব্যতিক্রমি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। সে কাজের অভিজ্ঞতা এবং প্রাসঙ্গিক বিষয়বস্তু নিয়ে আলাপ করেছেন তিনি। 

জলকুমারীনাটকে প্রথমবারের মতো বিধবার চরিত্র করলেন, চরিত্রটি কেমন?

এ নাটকে আমি ‘অর্চনা’ চরিত্রে অভিনয় করছি। মেয়েটার অল্প বয়সে বিয়ে হয় এবং বিধবা হয়ে যায়। মেয়েটার অন্ধ শ্বশুর তাকে খুব ভালোবাসেন, সে চরিত্রটি করেছেন খোকা চাচা (রচয়িতা পান্থ শাহরিয়ারের বাবা)। এ চরিত্রে অন্ধ শ্বশুর নিয়ে পথে পথে ঘুরেছি, কোন ঠাঁই ছিল না, ভিক্ষা করতে হবে এ অবস্থা। সেখানে আশ্রয়ণ প্রকল্প হতে কিছু ঋণ পাই, মাথা গোঁজার ঠাঁই পাই। সেলাই মেশিন পাই, প্রশিক্ষণ নেই, তারপরে স্বাবলম্বী হয়ে যাই। এর মধ্যে মেয়েটার গল্প চলতে থাকে।

শুটিং কি চলছে?

আমার অংশগুলোর শুটিং শেষ, বাকিগুলো চলছে।

‘জলকুমারী’ নাটকের একটি দৃশ্যে মৌটুসী বিশ্বাস

এ নাটকে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

এ ধরনের ক্যারেক্টার আমার জন্য নতুন। নিয়াজ মাহবুবের পরিচালনায় এটাই আমার প্রথম কাজ। ও ক্যামেরার কাজ করলে আমি খেয়াল করি ও কি করে, ও অভিনয় ভাল বোঝে। সে যেহেতু ক্যামেরার কাজ করেছে সেহেতু সে প্রিসাইজ কাজ করে। সে জানে কতটুকু নিতে হবে। টিম ভালো ছিল, আমার কো-এক্টররা খুব ভাল ছিলেন। সরকারের যে ইনফরমেশনগুলো দেয়ার জন্য এ নাটক, আমার মনে হয় গল্পের মাধ্যমে খুব সুন্দর করে এ ইনফরমেশনগুলো দেয়া গেছে। পরিচালক ভিন্ন ভিন্ন গল্পকে সুন্দরভাবে জোড়া দিয়েছেন।

পাফ ড্যাডিওয়েব সিরিজে অভিনয়ের কথা শোনা গিয়েছিল, কাজ করছেন ওখানে?

আমার সাথে প্রাথমিকভাবে কথা হয়েছিল, এরপর আর কথা হয়নি। পরিচালকের টিম থেকে আমার সাথে কথা হয়েছে সত্যি, কিন্তু পরিচালকের সাথে আমার এখনো কথা হয়নি। আমি অপেক্ষা করছি, উনার সাথে কথা হলে বিষয়টা আমি কনফার্ম করতে পারব।

‘পাফ ড্যাডি’ ওয়েব সিরিজে কাজ চূড়ান্ত হয়নি, হলে জানাবেন মৌটুসী

সিনেমায় কাজ করা নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন?

গতবছর আমি কয়েকটা সিনেমার অফার পেয়েছিলাম। কিন্তু একটাতেও আমার মন টানেনি। অভিনয় করা আমার পেশা। সিনেমায় অর্থকড়ি বেশি, তারমানে এই নয় যে পয়সার জন্য আমি সিনেমায় কাজ করব। সিনেমায় যদি কাজ করি আমি আমার নিজের জন্য করব, দর্শকের জন্য করব। সিনেমায় আমি অর্থকে প্রাধান্য না দিয়ে গল্প, চরিত্র, মেকিং এগুলোকে প্রাধান্য দিতে চাই। আমার যখনই মনে হয় এখানে কোন ফাঁক আছে, তখন আমি সরে আসি। আমি ওয়েট করছি, আমি সিনেমা করতে চাই। আমি ফাঁকি দিয়ে কাজ করিনা কখনো, অন্তত সিনেমার ক্ষেত্রে যিনি সিনেমা বানাবেন তিনি যেন ফাঁকি না দিয়ে কাজ করেন।

মৌটুসী সিনেমার জন্য ওয়েট করছেন

রান্নার অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতে দেখা যাচ্ছে আপনাকে, কেমন লাগছে?

নাগরিক টিভিতে ‘রান্নার এক্সপার্ট’ শিরোনামের একটি অনুষ্ঠান করছি কয়েকমাস হলো। আমি এর আগে নিজে কখনো রান্না করে অনুষ্ঠান করিনি। আমার সামনে কেউ রান্না করেছেন, রান্নার কম্পিটিশান হোস্ট করেছি, গেস্ট হয়ে গিয়েও রান্না করেছি অনেক অনুষ্ঠানে। কিন্তু এই প্রথমবার আমি হোস্ট, আমিই রান্না করছি, আমার গেস্ট আসলেও দেখা যাচ্ছে আমিই রান্না করে দিচ্ছি, সে এক মজার অভিজ্ঞতা। আমার সাথে স্ট্যান্ড বাই একজন শেফ থাকেন। যেহেতু আমি রেগুলার কুক না, এজন্য চ্যানেল ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আমি এ অনুষ্ঠান নিয়ে ভালো ফিডব্যাক পাচ্ছি অজানা জায়গায়। ধরেন ডাক্তার দেখাতে গেলাম সেখানে একজন বলল, ‘আপা আপনার রান্নার অনুষ্ঠানটা ভাল লাগে। কিন্তু আপা কয়টার সময় দেখায় মনে থাকে না।’ আমার চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অনুষ্ঠানটা যাতে ঐ জায়গায় নিয়ে যেতে পারি। যাতে যারা এটা পছন্দ করেন তারা মনে রাখতে পারেন এটা কোনদিন কোন সময় হচ্ছে।

‘রান্নার এক্সপার্ট’ অনুষ্ঠানটি নিয়ে ভাল ফিডব্যাক পাচ্ছেন মৌটুসী

ইদানিং দর্শক টেলিভিশনে নাটক না দেখে ইউটিউবে দেখছে, ব্যাপারটা কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

একসময় আমরা একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাড়ি পৌঁছে যেতাম। তখন ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, নেটফ্লিক্স ছিল না। আমি নিজেও ইউটিউবে নাটক দেখি, কোন চ্যানেলে কখন কি যাচ্ছে আমি নিজেও জানিনা। আগে চ্যানেল কম ছিল এবং ভাল ভাল নাটক দেখাত। এখনও ভাল নাটক হচ্ছে, তবে বাজেট কমে গেছে। যখন ভাল নির্মাতাকে চাপিয়ে দেয়া হয় যে নির্দিষ্ট তারকা শিল্পীকে নিতে হবে তখন নাটক আর গল্পকেন্দ্রীক থাকছেনা। যারা অনির্মাতা তারা চাপিয়ে দেয়া পারফর্মারদের নিয়ে কোনরকম স্ক্রীপ্ট লিখে নাটক বানিয়ে ফেলে নির্মাতা হয়ে যাচ্ছে। এতে করে যারা গল্প নিয়ে কাজ করতে চান তারা তাদের সুযোগ হারাচ্ছেন। আমাদের নাটকে আর গল্প নেই। চ্যানেল বা স্পন্সর যাই বলুক আমাদের দর্শক এট দ্য এন্ড অব দ্য ডে গল্প দেখতে চায়। টেলিভিশনের বড় তারকাদের কারণে আমরা দর্শক পাচ্ছি কিন্তু সেটা খুব বিশাল দর্শক নয়। অতোটা নয় যেটা সুন্দর একটি গল্প দিলে পাওয়া যেত। ভাল ভিউয়ারশিপের জন্য বড় বড় তারকাদের চেয়ে ডমিনেট করতে হবে গল্পকে। দুজন তারকা যদি পাঁচজনের রেমুনেরেশন নিয়ে যায় তাহলে কিন্তু তিনজন পারফর্মার কমে যাচ্ছে। তাহলে দুজন তারকাকে দিয়ে কি অভিনয়টা করাবেন? এ জায়গাটাতে যতদিন বোধোদয় হবে না, যতদিন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলবে এটাই হতে থাকবে।

মৌটুসী মনে করেন পুরনো গুণী নির্মাতাদের নাটকে ফিরিয়ে আনলে দর্শক টেলিভিশনমুখী হবে

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কি?

অবশ্যই বাজেট বাড়াতে হবে এবং তা দিতে হবে সঠিক নির্মাতাদের। আমি যাদের সাথে কাজ করতাম তারা বাড়িতে বসা। উনাদেরকে আবার ফেরাতে হবে। পুরনো অনেক নির্মাতা আছেন ভাল কাজ করতে চান, গল্পনির্ভর কাজ করতে চান। কিন্তু যেভাবে চাপিয়ে দেয়া হয় সেভাবে তারা কাজ করতে পারছেন না। সবগুলো চ্যানেল মিলে একটা ডিসিশান নিতে পারে। যারা মূল টাকাটা দিচ্ছে তাদের উপর নির্ভর করে অনেককিছু। আরেকটা বিষয় হলো আমাদের চ্যানেলগুলো পে চ্যানেল নয়। সেজন্য স্পন্সর যা চাইবে তাই হবে, দর্শকের বলার কিছু নেই। দর্শকের পছন্দ অপছন্দকে কেউ আমল দিচ্ছে না। পে চ্যানেল হয়ে গেলে অটোমেটিক্যালি ভাল গল্প চলে আসবে।

শিল্পী সংঘের কার্যক্রমে আস্থা রাখছেন মৌটুসী

সম্প্রতি শিল্পী সংঘের নির্বাচন হলো, নির্বাচিতদের কাছে কি প্রত্যাশা করছেন?

আমি প্রত্যাশা করি না যে দুই বছরে বিশাল পরিবর্তন হয়ে যাবে, সব সিস্টেম ঠিক হয়ে যাবে। গত দুই বছর ধরে অভিনয় শিল্পী সংঘ কাজ করেছে। এখন সিস্টেমটা এত পঙ্গু হয়ে গেছে যে এতে সময় লাগবে। কিন্তু ঐ চেষ্টাটা শুরু হয়ে গেছে। আমি বিশ্বাস করি আমাদেরকে যারা রিপ্রেজেন্ট করছেন তারা ঐ চেষ্টাটা আগামী দুই বছর চালিয়ে যাবেন।