‘ফাগুন হাওয়ায়’ মন জুড়ালো . . .

চলতি সময় থমকে দাঁড়ায়, জেগে জেগে স্বপ্ন দেখি হায়

তোমারই হাত ধরতে চায়, ফাগুন হাওয়ায় . . .

আজ থেকে প্রায় ছয় দশকের একটু বেশি সময় আগে এক ফাগুনে ভাষার জন্য জ্বলে উঠেছিল বাংলাদেশের মানুষ। সেই সময় নিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে পূর্ণাঙ্গ কোন চলচ্চিত্র হয়নি। এত বছরের আক্ষেপ ২০১৯ সালে এসে ফুরালো। ভাষা আন্দোলনভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ফাগুন হাওয়ায়’ সেই হাহাকার মেটালো।

তৌকীর আহমেদ এককালে টেলিভিশনের ব্যস্ততম নায়ক ছিলেন। কালক্রমে তিনি পর্দার পেছনে নিজের মেধা কাজে লাগাতে শুরু করলেন। নির্মাতা তৌকীর আহমেদ কখনো কখনো অভিনেতা তৌকীরকেও হার মানান। আমার চোখে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের যে অল্প কয়জন নির্মাতার উপর আস্থা রাখা যায় তাঁদের একজন এই স্থপতি। নিজের পরিচালিত ষষ্ঠ সিনেমা ‘ফাগুন হাওয়ায়’ তিনি যেন নিজেকে আরেকবার চেনালেন।

সিনেমার শুরুতে এক পাখি বিক্রেতার দেখা মেলে। নানারকম পাখি খাঁচায় ভরে বিক্রির উদ্দেশ্যে রেখেছে সে। সেসব পাখির স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলে পাশ দিয়ে যাওয়া যুবক নাসিররূপী সিয়াম। এরপর পর্যায়ক্রমে দেখা যায় আরো কিছু চরিত্রকে। ঝলক দেখা যায় বদমেজাজী পুলিশ অফিসার জামশেদের (যশপাল শর্মা), দীপ্তির (নুসরাত ইমরোজ তিশা)। সময় গড়াতে থাকে, গল্প এগুতে থাকে সময়ের হাত ধরে। যুক্ত হয় নতুন নতুন চরিত্র।

পঞ্চাশের দশকের শুরুর সময়ে এক মফস্বলে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা নিয়েই সাজানো হয়েছে চলচ্চিত্রটি। ভাষা আন্দোলনের সময়ে মফস্বল শহরটিতে মাতৃভাষা রক্ষার জন্য তরুণ-যুবার নানারকম প্রতিবাদের চিত্র তুলে ধরেছেন তৌকীর আহমেদ। ছোট ছোট ঘটনা মনে করিয়ে দেয় সে সময়ে মানুষের হৃদয়ে কেমন রক্তক্ষরণ হয়েছিল।

উর্দুকে বাঙালীর উপর চাপিয়ে দেয়ার মনোভাব ছিল মূল চরিত্রের। পাকিস্তানি শোষক গোষ্ঠীর রূপক যেন এ চরিত্র। অন্যদিকে প্রতিবাদমুখর চরিত্রগুলো যেন লাখো বাঙালীর ভূমিকা তুলে ধরেছিল।

ছবিতে কিছু প্রয়োজনীয় হাস্যরস পাওয়া যায়। সংলাপগুলো মানানসই ছিল। চিত্রনাট্য ও কাহিনী ভালো। কিছু কিছু দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে গেছে। ড্রোন দিয়ে নেয়া বিশাল ক্যানভাসের ছবি চোখকে তৃপ্তি দিয়েছে।

তবে ছবির শেষটুকু দেখে মনে হতেই পারে এরপর আরো কিছু থাকতে পারতো। কিছু চরিত্রের গন্তব্য না দেখিয়েই শেষ করে দেয়া হলো যেন।

ইতিহাস নির্ভর সিনেমা বানাতে গেলে ইতিহাসকে তুলে ধরতে হয় যেভাবে ছিল সেভাবেই, এর ব্যতিক্রম হতে পারে। তবে তা হতে হবে পরিমিতভাবে। ‘ফাগুন হাওয়ায়’ সিনেমাটিতে ভাষা আন্দোলনের সময়কে ধরার চেষ্টা লক্ষ্যণীয় ছিল। কিন্তু সব ঘটনা সত্য তাও মনে করার কোন কারণ নেই, কারণ এটি ফিকশন।

টিটো রহমান লিখেছিলেন ছোট গল্প ‘বউ কথা কও’। সেই গল্পের অনুপ্রেরণায় একটি সিনেমা নির্মাণ করার মতো গল্প, চিত্রনাট্য লেখা খুব একটা সহজ নয়। সে কাজটিই করেছেন তৌকীর আহমেদ। এজন্য তিনি একটি সাধুবাদ পেতেই পারেন। মাত্র দুই পৃষ্ঠার গল্পের আলোকে তিনি বানিয়ে ফেলেছেন প্রায় দুই ঘন্টার একটি সিনেমা!

 

সিনেমার মূল চরিত্র ছিল একজন পাকিস্তানি পুলিশ অফিসার। তৌকীর আহমেদ বিভিন্ন সময়ে বলেছেন তিনি এই চরিত্রে এমন একজনকে খুঁজছিলেন যিনি স্বল্প পরিচিত এবং ভালো উর্দু বলতে পারেন। তিনি তাই বেছে নিয়েছেন ভারতের যশপাল শর্মাকে। সিনেমায় নিজের অভিনয় দক্ষতা সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। মনেই হয়নি তিনি অভিনয় করছেন, মনে হচ্ছিল এই ভদ্রলোকই যেন বায়ান্ন’র এক বদমেজাজি পাকিস্তানি পুলিশ অফিসার। যোগ্য অভিনেতাকে চরিত্রটির জন্য খুঁজে পেয়ে তাকে ঠিকঠাক কাজে লাগাতে পারাও এক ধরনের বিজয়। এজন্য আরো একবার স্যালুট পাবেন নির্মাতা, তৌকীর আহমেদ।

বাংলাদেশের নারী অভিনয় শিল্পীদের মাঝে প্রথমসারির অভিনেত্রীদের একজন নুসরাত ইমরোজ তিশা। তৌকীর আহমেদের ‘হালদা’ চলচ্চিত্রে একটু ম্যাচিউর চরিত্রে তাকে দেখেছিলাম। ‘ফাগুন হাওয়ায়’ তাকে দেখলাম এক তরুণীর চরিত্রে। তিনি মানিয়ে গেছেন সহজেই, পঞ্চাশের দশকের তরুণী দীপ্তি’র চরিত্রে তিশাই যেন পারফেক্ট।

সিয়াম আহমেদের সিনেমায় শুরু ‘পোড়ামন – ২’ দিয়ে। এরপর এসেছে ‘দহন’। সিয়ামকে কখনো সুজন শাহ কখনোবা তুলা চরিত্রে পাওয়া গেছে। কিন্তু এ ছবিতে একদম ভিন্ন এক সিয়ামকে পাওয়া গেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছেলে নাসিরের রক্তে দেশপ্রেম, ভাষা নিয়ে কোনরকম ছাড় দিতে সে রাজি নয়। সিনেমার মূল পুরুষ চরিত্র না হয়ে অভিনেতা হিসেবে এসে সিয়াম জানান দিলেন তিনি আসছেন, ভবিষ্যতে চরিত্রের দিকে মনোযোগ দিলে সিয়াম হতে পারেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের ভরসার নাম।

যার কথা না বললে অবিচার করা হবে তিনি সাজু খাদেম। তিনি এত ভালো অভিনয় করেন যে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকতে হয়। বরাবরের মতো তিনি তাঁর চরিত্রে ছিলেন সফল, আরো একবার আফসোস বাড়িয়েছে সাজুর অভিনয়। তাঁকে আমরা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছিনা।

ফারুক আহমেদ, ফজলুর রহমান বাবু, রওনক হাসান, আবুল হায়াত, শহীদুল আলম সাচ্চু, নরেশ ভূঁইয়া, আফরোজা বানুসহ প্রায় সকলেই নিজের চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে যত্নবান ছিলেন। কিংবা বলা চলে তাঁদের অভিনয় দক্ষতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পেরেছেন নির্মাতা তৌকীর আহমেদ। সিনেমায় গুণী শিল্পী থাকলেই হয়না, তাঁদের চরিত্রে তাঁদের মানিয়ে নেয়াতে জানতে হয়। তৌকীর আহমেদ বিষয়টা জানেন, ‘ফাগুন হাওয়ায়’ চলচ্চিত্রে তা আরো একবার বোঝালেন।

শুরু করেছিলাম দুই কলি গান দিয়ে। ছবিতে এই একটি গানই পূর্ণাঙ্গভাবে এসেছে। গানের কথা, সুর ও কণ্ঠ হৃদয় ছুঁয়ে যায়। পিন্টু ঘোষ ও সুকন্যা মজুমদার ঘোষের দরদী কণ্ঠ মনের গহীনে অদ্ভূত মাদকতার সৃষ্টি করে। গানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ চিত্রায়ন ছিল তৃপ্তিদায়ক।

আমি চলচ্চিত্রকে কোন রেটিং দেয়ার যোগ্য নই। বলতে পারি সিনেমাটি একটি সুস্থধারার চলচ্চিত্র। এ ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে বসেই দেখা উচিৎ, ছোটপর্দায় নয়। অন্তত নির্মাতার প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়েই তা করতে হবে সিনেপ্রেমীদের।

ভাষা আন্দোলনের মাসে ফাগুনের এক সন্ধ্যায় দেখে নিতে পারেন, ফাগুন হাওয়ায়। সে সময়টাকে কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারবেন।