বাচ্চু শ্রোতাদের আপন করে নিতে পারত : কুমার বিশ্বজিৎ

পেইজ থ্রি ডেস্ক ।। ৪১ বছর আগে ব্যান্ড ৭৭ দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করি। ওকে ফিলিংসে  নিয়ে এসেছিলাম ১৯৭৮ সালে । ১৯৮২ সালে তাকে ফেলে ঢাকায় এসে সলো ক্যারিয়ার শুরু করেছিলাম। সে বছর ও ঢাকায় এসে সোলস-এ যোগ দিল, আবার একসাথে সময় কাটানোর সুযোগ হলো আমাদের।

রাত দিন অনুশীলন করে, নানান পরিকল্পনা করে ঢাকা-চট্টগ্রামের প্রায় সব ধরনের অনুষ্ঠানে গান গাইতাম আমরা। বাচ্চু শ্রোতাদের সহজে আপন করে নিতে পারত যেটা ছিল তার বড় গুণ। সে মঞ্চে উঠলেই স্বতস্ফূর্ত হাততালি পেত। সে দেশি-বিদেশী নানান গান শুনতো, মিউজিকের প্রতি তার ডেডিকেশন ছিল প্রচন্ড।

আমি কিবোর্ড বাজাতাম, বাচ্চু গিটার। সে দেশ ও ওয়েস্টার্ণ ব্ল্যান্ডিং করতে পারতো। সে রিস্ক নিয়ে ফিউশনটাকে এগিয়েছে। তার সাথে ৭৫ সালে আমার পরিচয় একই এলাকায় থাকার সুবাদে। আমাদের পারিবারিক বাধা ছিল গান-বাজনায়। কিন্তু খালাম্মা (আইয়ুব বাচ্চুর মা) আমাকে বিশ্বাস করে বলতেন কাজ শেষে বাচ্চুকে যেন দিয়ে যাই। আমার মাও বাচ্চুকে ছেলের মতো জানতো। সে সময়ে কাজ শেষ করে বাসায় ঢুকতে রাত হতো, তখন আমার মা আমাদের রান্না করে খাওয়াতেন। কদিন আগেও মা বলছিলেন, বাচ্চুকে একটু আসতে বলিস।

আজ সকালে টিভি স্ক্রলে খবরটা দেখে ভাবলাম অন্য কোন আইয়ুব বাচ্চু, পড়ে যখন খেয়াল করে দেখলাম সঙ্গীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু – তখন চিৎকার করে বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠলাম। এভাবে তার মৃত্যুসংবাদ শুনতে হবে ভাবিনি। তার বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা ও শান্তি কামনা করি। সুখ এটুকুই, একটা সাকসেসফুল মিউজিক্যাল লাইফ পার করে গেছে আমার বন্ধু।

৭৮-৭৯ এর দিকে আমরা ঢাকা এসেছিলাম। সাকুরা বারে অডিশন দিতে আসতাম, টিকে গেলে নিয়মিত বাজানোর সুযোগ পাব। অডিশনে ডাক পাচ্ছিলাম না, পকেটের টাকা ফুরিয়ে আসছিল। একরাতে দেখলাম আমাদের দুজনের হাতে মাত্র ১৫ টাকা আছে। সেটা দিয়ে কি করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। বাচ্চু খাওয়ার পরামর্শ দিল। কমের মধ্যে পরোটা আর ভাজি আনালাম বেয়াড়াকে দিয়ে। এরমাঝে হুট করে সেটি নিচে পড়ে গেলে বাচ্চু তুলে নিল। তৃপ্তি করে তা খেলাম দুজনে। আহারে বাচ্চু… তোর এইসব স্মৃতির ভার আমি আর বইতে পারছি না।

বাচ্চুর নিথর দেহ হাসপাতালে দেখে ভাবি আজকের ছেলেদের এত মসৃণ পথ বাচ্চুদের ঘামের বিনিময়ে তৈরী হয়েছে। এমন হাজার হাজার কষ্টের ঘটনা আছে আমার আর বাচ্চুর। যা বলে শেষ করা যাবে না।

আমরা তখন বিয়ে বাড়িতে মিউজিক করতাম। সারারাত অতিথিদের জাগিয়ে রাখার দায়িত্ব ছিল আমাদের। আগেরদিন সন্ধ্যা আটটা হতে পরেরদিন সকাল আটটা পর্যন্ত। কেউ মোহাম্মদ রাফি কেউ মান্না দে’র গান শোনাতে বলতো। একদিন আমরা অনুরোধ রাখতে পারিনি, ভুলে গিয়েছিলাম। তখন আমাদের পারিশ্রমিক দেয়নি জামাই, উল্টো আমাদের জিনিসপত্র রেখে দেন তারা। পরে ওসব ফেলে খালি হাতে শহরে ফিরে আসি।

আরেকবার বিয়ের অনুষ্ঠানে গাইতে উঠেছি, দেখলাম একজন দা হাতে ছুটে আসছে। দৌড়াতে দৌড়াতে শুনলাম তার বাবা নামাজি মানুষ, তিনি গান বাজনা হারাম বলেছেন। তাই এ ব্যক্তি আমাদের জবাই করতে আসছেন, গালিগালাজ তো আছেই সাথে। এসব শুনে বাচ্চু একদিকে দৌড়াচ্ছে আমি আরেক দিকে। পায়ে একজনেরও স্যান্ডেল নাই। এরমধ্যে এই দৌড়ের সঙ্গে পেছনে যুক্ত হয়েছে বাড়ির দুই তিনটা কুকুরও। শেষ সম্বল ইন্সট্রুমেন্টও ফেলে এসেছি।

মিউজিকের জন্য এই কষ্ট, এই বাঁচার দৌড়ে আমার বন্ধুটি প্রথম হয়ে গেল। তাকে ছাড়া আমি একা, বন্ধুহীন, পরাজিত একজন। আমাদের প্রতিযোগীতা থেমে গেল চিরদিনের জন্য।

Print Friendly, PDF & Email

মতামত দিন